সত্যের সন্ধানে সবসময়
পোর্টাল: www.vatirdarpan.com | প্রিন্টের সময়: ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:২৩ পিএম
কেন সব দেশই এখন ‘ফার্স্ট’ বলছে
বিশ্বের রাজনীতিতে গত এক দশকে একটি কৌতূহলোদ্দীপক পরিবর্তন ঘটেছে। মতাদর্শ আলাদা, রাজনৈতিক ব্যবস্থা আলাদা, অর্থনীতির কাঠামোও আলাদা, তবু একের পর এক দেশ যেন একই ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছে। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’, ‘চায়না ফার্স্ট’, ‘ইন্ডিয়া ফার্স্ট’, ‘ইতালি ফার্স্ট’, ‘পোল্যান্ড ফার্স্ট’, ‘নাইজেরিয়া ফার্স্ট’ এবং আরও অনেকে।
প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এটি বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত প্রতিক্রিয়া। গত তিন দশকের মুক্তবাজার, উন্মুক্ত বাণিজ্য ও বিশ্বায়নের প্রতি আস্থা হারিয়েই রাষ্ট্রগুলো যেন আবার অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের দিকে ঝুঁকছে। ব্যাখ্যাটি অর্ধসত্য।
এই স্লোগানগুলোর পেছনের অর্থনীতি নতুন নয়। দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া, আমদানি কমানো, ভর্তুকি দিয়ে শিল্প গড়ে তোলা কিংবা রাষ্ট্রের সক্রিয় শিল্পনীতি—এসবই বহু পুরোনো অর্থনৈতিক ধারণা। নতুন হলো এই ধারণাগুলোকে উপস্থাপনের রাজনৈতিক ভাষা।
সংবাদের ভেতরে আপনার বিজ্ঞাপন প্রদর্শন করতে চান?
সহজেই আকর্ষণীয় ইন-ফিড ব্যানার স্পটে আপনার ক্যাম্পেইন পরিচালনা করুন।
‘ফার্স্ট’ এখন এমন এক রাজনৈতিক হাতিয়ার, যা ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার দেশেও সমান কার্যকর। গণতন্ত্র হোক বা কর্তৃত্ববাদ, উন্নত অর্থনীতি হোক বা উন্নয়নশীল দেশ—সবখানেই এর আবেদন বাড়ছে। বিষয়টি বুঝতে হলে বিশ্বের তিনটি বড় অর্থনীতির দিকে তাকালেই যথেষ্ট।
যুক্তরাষ্ট্রে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’-এর শুরু একটি বাস্তব রাজনৈতিক ক্ষোভ থেকে। কয়েক দশকের বিশ্বায়নে মধ্য পশ্চিমের শিল্পাঞ্চল কর্মসংস্থান হারিয়েছে, অসংখ্য কারখানা চলে গেছে বিদেশে, আর শিল্পশ্রমিকদের একটি বড় অংশ মনে করেছে যে বিশ্বায়নের লাভ তারা পায়নি। ওয়াশিংটনের উত্তর-শুল্ক, ভর্তুকি ও শিল্পকে দেশে ফিরিয়ে আনার নীতি। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য আছে। যে শিল্প ফিরে আসছে, তা ষাটের দশকের শ্রমনির্ভর শিল্প নয়।
রাষ্ট্রের সক্ষমতা বাড়ানো আর রাষ্ট্রের ক্ষমতা বাড়ানো—দুটি এক জিনিস নয়। প্রথমটি একটি দেশকে শক্তিশালী করে। দ্বিতীয়টি একটি সরকারকে। যাত্রা শুরু হয় ‘দেশ আগে’ বলে। আর শেষ প্রান্তে দেখা দেয় এক পুরোনো ছায়া—সবকিছু গিয়ে ঠেকে ‘ক্ষমতা আগে’র দরজায়।
রোবট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশননির্ভর এই কারখানাগুলো উৎপাদন ফিরিয়ে আনতে পারে, কিন্তু আগের মতো কর্মসংস্থান নয়। ফলে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ শুধু শিল্প ফিরিয়ে আনার প্রকল্প নয়; এটি এমন এক সামাজিক বাস্তবতা পুনর্গঠনের চেষ্টা, যার অর্থনৈতিক ভিত্তিই বদলে গেছে।
সংবাদের ভেতরে আপনার বিজ্ঞাপন প্রদর্শন করতে চান?
সহজেই আকর্ষণীয় ইন-ফিড ব্যানার স্পটে আপনার ক্যাম্পেইন পরিচালনা করুন।
চীনের গল্প আলাদা হলেও যুক্তি শেষ পর্যন্ত একই। আবাসন খাতের দীর্ঘ সংকট ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার দুর্বলতার মধ্যে বেইজিং আবার উৎপাদন ও রপ্তানির ওপর জোর দিয়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি ও সৌরপ্রযুক্তিতে রাষ্ট্রের বিপুল বিনিয়োগের লক্ষ্য রপ্তানি বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা সামাল দেওয়া। তবে সেই পথ আগের মতো সহজ নেই।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপ, এমনকি উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশই যখন নিজেদের বাজার সুরক্ষিত করছে, তখন চীনের রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি প্রথমবারের মতো ভূরাজনৈতিক সীমার মুখোমুখি। উৎপাদন করা আর বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা এক জিনিস নয়।
ভারতের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ ফিরিয়ে এনেছে আরেকটি পুরোনো ধারণা—আমদানির বিকল্প শিল্পায়ন। উচ্চ শুল্ক, দেশীয় উপাদান ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা এবং বিদেশি নির্ভরতা কমিয়ে দেশের ভেতরে শিল্প গড়ে তোলার চেষ্টা।
স্বাধীনতার পর এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশ এ পথেই হেঁটেছিল। কিছু সাফল্য এলেও বহু ক্ষেত্রে সুরক্ষাপ্রাপ্ত শিল্প আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার আগেই রাজনৈতিকভাবে এত শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে তারা দক্ষতার চেয়ে সুরক্ষাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। নীতির আশ্রয়েই তাদের টিকে থাকা সহজ হয়।
তিন দেশের নীতি এক নয়, রাজনৈতিক ব্যবস্থাও এক নয়। তবু একটি জায়গায় তারা মিলিত। জাতীয় শক্তি বাড়াতে হলে উৎপাদনের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে হবে, বিদেশিনির্ভরতা কমাতে হবে এবং অর্থনীতিতে সরকারের ভূমিকা আরও বিস্তৃত করতে হবে—তিন দেশই এ বিশ্বাসে আস্থাশীল।
এসবই পুরোনো ধারণা। নতুন কী? এগুলো এখন আর শুধু অর্থনৈতিক নীতি নয়, একটি রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিণত হয়েছে। ‘ফার্স্ট’ এখন এক বিশ্বজনীন রাজনৈতিক ভাষা। বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর বাইরে তাকালেই বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়।

পোল্যান্ড, ইতালি, যুক্তরাজ্য কিংবা ইসরায়েলের মতো সংসদীয় গণতন্ত্রে ‘ফার্স্ট’ ভাষা দ্রুত জনপ্রিয় হয়েছে, এমনকি বাংলাদেশেও। মজার বিষয় হলো, এসব দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থনৈতিক কর্মসূচি একে অন্যের সঙ্গে খুব একটা মেলে না। কোথাও কল্যাণরাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান, কোথাও কর কমানোর প্রতিশ্রুতি, কোথাও অভিবাসনবিরোধী রাজনীতি, আবার কোথাও জাতীয় সার্বভৌমত্ব। অর্থনৈতিক নীতিতে মিল কম, কিন্তু রাজনৈতিক ভাষায় মিল লক্ষণীয়।
‘ফার্স্ট’ কেবল অর্থনৈতিক কর্মসূচি বা কোনো সুসংহত অর্থনৈতিক মতবাদও নয়; বরং এটি এমন একটি রাজনৈতিক সংকেত, যার মাধ্যমে ভোটারকে বলা হয়—রাষ্ট্র আবার তার নাগরিকদের পক্ষে দাঁড়াবে, বাইরের স্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে এবং বিশ্বায়নের যুগে হারিয়ে যাওয়া নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনবে। এই ভাষার শক্তি এখানেই। বিশ্বায়ন, বৈষম্য, অভিবাসন, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা কিংবা সাংস্কৃতিক উদ্বেগ—এসব জটিল প্রশ্নকে এটি একটি সহজ বার্তায় নামিয়ে আনে—‘এত দিন অন্যদের কথা ভাবা হয়েছে। এবার নিজেদের কথা ভাবার সময়।’
এরপর অর্থনীতির জটিল বিতর্ক আর কেন্দ্রে থাকে না। শুল্ক কত হওয়া উচিত, ভর্তুকি কতটা কার্যকর, কোন শিল্পে বিনিয়োগ লাভজনক—এসব প্রশ্নের জায়গায় চলে আসে একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন—আপনি দেশের পক্ষে, নাকি দেশের বিরুদ্ধে? এ কারণেই ‘ফার্স্ট’ এত দ্রুত এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। একটি অর্থনৈতিক নীতি সহজে ভ্রমণ করে না; একটি রাজনৈতিক ভাষা করে। এখন কেন? ঠিক এখনই এগুলো এত জনপ্রিয় হয়ে উঠল কেন? সহজ উত্তর—পৃথিবী বদলে গেছে।
এখানে অদৃশ্য ঝুঁকি আসলে কী? ধরা যাক, সরকার সিদ্ধান্ত নিল কোন শিল্পকে ভর্তুকি দেওয়া হবে, কোন কোম্পানি হবে ‘জাতীয় চ্যাম্পিয়ন’, আর কোন প্রযুক্তি কৌশলগত খাত হিসেবে বিবেচিত হবে। এ ক্ষমতা একবার রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত হলে সফল হওয়ার জন্য শুধু দক্ষ হওয়াই যথেষ্ট থাকে না; সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দক্ষতার প্রতিযোগিতার পাশাপাশি শুরু হয় প্রভাবের প্রতিযোগিতা, উদ্ভাবনের পাশাপাশি লবিং। ধীরে ধীরে শিল্পনীতি শিল্পোন্নয়নের নীতির চেয়ে রাষ্ট্র ও ব্যবসার সম্পর্ক ব্যবস্থাপনার নীতিতে পরিণত হয়।
রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভূমিকা যত বাড়ে, রাষ্ট্রকে ঘিরে বিশেষ স্বার্থও তত শক্তিশালী হয়। সুরক্ষা বিশেষ সুবিধায় পরিণত হয়, ভর্তুকি পরিণত হয় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায়। অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ অনেক সময় এমন একটি কাঠামো তৈরি করে, যেখানে রাষ্ট্র ও প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠী একে অন্যকে আরও শক্তিশালী করে। এটি সব দেশে একইভাবে ঘটে না।
যুক্তরাষ্ট্র বা ভারতের মতো গণতন্ত্রে ‘ফার্স্ট’ রাজনীতি অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদকে কেন্দ্র করে নতুন নির্বাচনী জোট গড়ে তোলে। একই সঙ্গে বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীও রাষ্ট্রের আরও কাছাকাছি চলে আসে। ‘চায়না ফার্স্ট’-এর মধ্য দিয়েও রাষ্ট্র প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও কৌশলগত শিল্পের ওপর আরও দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, যাতে অর্থনীতির কোনো শক্তিকেন্দ্র একদিন রাজনৈতিক শক্তিকেন্দ্রে পরিণত হতে না পারে। পথ আলাদা। প্রতিষ্ঠান আলাদা। কিন্তু প্রণোদনা একই।
এর পরিণতি কী? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখানেই। ক্ষমতা যদি অনিশ্চয়তা থেকেই শক্তি পায়, তাহলে সেই রাজনীতির কি সত্যিই অনিশ্চয়তা দূর করার প্রণোদনা থাকে? এ কারণেই আজকের ‘ফার্স্ট’ বর্ণনাকে শুধু সুরক্ষাবাদ বা শিল্পনীতির প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখলে পুরো ছবি ধরা পড়ে না। এর আসল শক্তি অর্থনৈতিক সাফল্যে নয়; অনিশ্চয়তাকে রাজনৈতিক পুঁজিতে পরিণত করার দক্ষতায়। আর সেখানেই লুকিয়ে থাকে তার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
রাষ্ট্রের সক্ষমতা বাড়ানো আর রাষ্ট্রের ক্ষমতা বাড়ানো—দুটি এক জিনিস নয়। প্রথমটি একটি দেশকে শক্তিশালী করে। দ্বিতীয়টি একটি সরকারকে। যাত্রা শুরু হয় ‘দেশ আগে’ বলে। আর শেষ প্রান্তে দেখা দেয় এক পুরোনো ছায়া—সবকিছু গিয়ে ঠেকে ‘ক্ষমতা আগে’র দরজায়।
● জাহিদ হোসেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ
* মতামত লেখকের নিজস্ব
আপনার ব্র্যান্ডের প্রচার বাড়াতে আমাদের বিজ্ঞাপন পেজে আসুন
পাঠকদের মতামত 0
শালীন ও গঠনমূলক মন্তব্য কাম্যসাউথইস্ট ইউনিভার্সিটিতে ওয়ার্ল্ড পোয়েট্রি ডে ২০২৬ উদ্যাপন
২৩ জুলাই, ২০২৬বিশ্বকাপ ফাইনাল আবারও আয়োজনের দাবিতে সই করেছেন ৬২ হাজার আর্জেন্টাইন ভক্ত
২৩ জুলাই, ২০২৬রয়টার্সের প্রতিবেদন: শুক্রবারই পদত্যাগ করতে পারেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন
২৩ জুলাই, ২০২৬বাবা–মেয়েকে হত্যায় ৫ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল, ধর্ষণের সাজা কমে যাবজ্জীবন
২৩ জুলাই, ২০২৬লাইফ সাইকেল
২৩ জুলাই, ২০২৬মব সৃষ্টি করে পুলিশের হ্যান্ডকাফসহ ছিনিয়ে নেওয়া আসামি বাঁশখালীতে গ্রেপ্তার
২৩ জুলাই, ২০২৬ফটো কার্ড স্টাইল নির্বাচন করুন
সংবাদের ছবি দিয়ে কিভাবে ফটো কার্ডটি ডাউনলোড করতে চান অপশন সিলেক্ট করুন
ভাটির দর্পন
সত্যের সন্ধানে সবসময়
কেন সব দেশই এখন ‘ফার্স্ট’ বলছে
ভাটির দর্পন
সত্যের সন্ধানে সবসময়